More Services

News

This is default featured slide 1 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 2 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 3 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 4 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

This is default featured slide 5 title

Go to Blogger edit html and find these sentences.Now replace these sentences with your own descriptions.

Monday, November 30, 2020

ভাস্কর্য কি ইসলাম বিরোধী ?

 

ভাস্কর্য কি ইসলাম বিরোধী ?


হাইকোর্টের জাস্টিসিয়া ভাস্কর্য অপসারণের দাবি ওঠার পর আমরা অনেকেই বলেছিলাম যে তাদের দাবি এখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় এবার সফল হলে পরবর্তীতে সকল ভাস্কর্য ও কবর ভাঙার দাবি তোলা হবে। বাংলাদেশ যে আফগানিস্তানের দিকে যাচ্ছে তা সকলে টের পান কিনা ঠিক জানি না!

আফগানিস্তানের অনুকরণে সম্প্রতি বাংলাদেশেও ভাস্কর্য ভাঙার দাবি তুলেছে কওমি বা দেওবন্দি হিসেবে পরিচিতদের একটি অংশ। তারা সকল ভাস্কর্যের বিরোধী নাকি শুধু বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের ক্ষেত্রেই তাদের আপত্তি তা অবশ্য তারা সুস্পষ্টভাবে বলেননি।

মাসিক আল কাউসার ও জামায়াতে ইসলামীর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত দুটি লেখাকে ভিত্তি করে মাওলানা মামুনুল হক সোশ্যাল মিডিয়ায় 'ফতোয়া' প্রকাশ করেছেন। 'খোদ বাংলা ভাষার গ্রহণযোগ্য প্রতিটি ডিকশনারি' এর সূত্র দিয়ে তিনি আরবি ভাষাকেন্দ্রিক ইস্যুতে 'ফতোয়া' দিয়েছেন।


গরম সব খবর এখানে দেখুন >>>>> 


তার লেখায় 'ভাস্কর্য ও মূর্তি এক ও অভিন্ন' উল্লেখের পাশাপাশি পাকা কবর ও ক্যান্টনমেন্টে স্থাপিত শিখা অনির্বাণকেও ইসলাম বিরোধী বলা হয়েছে। মূর্তি হলে কি ভাঙতে হবে?

হাইকোর্টের জাস্টিসিয়া ভাস্কর্য অপসারণের দাবি ওঠার পর আমরা অনেকেই বলেছিলাম যে তাদের দাবি এখানেই সীমাবদ্ধ থাকবে না। তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় এবার সফল হলে পরবর্তীতে সকল ভাস্কর্য ও কবর ভাঙার দাবি তোলা হবে। বাংলাদেশ যে আফগানিস্তানের দিকে যাচ্ছে তা সকলে টের পান কিনা ঠিক জানি না!

ভাস্কর্য ও শিল্পকর্মের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট

১. সাহাবীদের সময়কাল থেকে কোনো ভূখণ্ডে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার পর ভাস্কর্য বা মূর্তি ভাঙ্গার ঘটনা ঘটেনি। গুটিকয়েক বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া পরবর্তীতেও এ ধারা অব্যাহত ছিল।

২. ১৯৩৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টে বিশ্বের ১৮ জন আইন প্রণেতার ভাস্কর্য স্থাপন করা হয় যার একটি ছিল হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর। সে ভাস্কর্যের এক হাতে ছিল কোরআন, অন্য হাতে তরবারি। আজহারিসহ অনেক মাওলানা সাহেব গর্বের সঙ্গে এটি উল্লেখ করেন।

৩. ১৯৫৫ সাল পর্যন্ত নিউ ইয়র্কের কোর্টে রাসুল (সাঃ) এর ভাস্কর্য ছিল। পাকিস্তান, ইন্দোনেশিয়া ও মিশরের রাষ্ট্রদূত ভাস্কর্যের মুখমণ্ডল সমান করে দেয়ার দাবি করে আপত্তি তুলেছিল।


গরম সব খবর এখানে দেখুন >>>>> 


৪. তৈমুর লংয়ের ছেলে শাহরুখ মির্জার শাসনামলে লিখিত 'মেরাজ নামা'য় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ছবি আঁকা হয়েছিল, যা লাইব্রেরি অব ফ্রান্সে সংরক্ষিত আছে।

৫. ইরানে কাজার ডাইনাস্টির শাসনামলে পঞ্চ পাঞ্জতনের কাহিনী প্রকাশিত হয়েছিল চিত্রকর্মের মাধ্যমে।

৬. তুরস্কের ব্রিজম্যান আর্ট গ্যালারিতে ওসমানিয়া খেলাফতের সময়কার পেইন্টিং আছে যেখানে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর ছবি আঁকা হয়েছে।

৭. পাকিস্তানে জিন্নাহর ভাস্কর্য রয়েছে বহু স্থানে। লাহোরে বেনজীর ভুট্টো ও লাজপত রায়ের ভাস্কর্য রয়েছে। ইরান, ইরাক, মরক্কো ও তুরস্কে শতাধিক ভাস্কর্য রয়েছে। মানুষের ভাস্কর্য আছে কুয়েত, কাতার ও দুবাইয়েও। সম্ভবত আফগানিস্তান ছাড়া সকল মুসলিম দেশেই ভাস্কর্য রয়েছে।

৮. সৌদি আরবে কি ভাস্কর্য নেই? সৌদি আরবে উটের ভাস্কর্য রয়েছে, সৌদি আরবের জেদ্দা মিউজিয়ামে ভাস্কর্য রয়েছে। সেখানে আয়োজিত মেলায় স্ট্যাচু অব লিবার্টির রেপ্লিকা ও শয়তানের ভাস্কর্যের প্রদর্শনী হয়েছিল।

যে উদাহরণগুলো দিয়েছি তাতে মহানবী (সাঃ) এর ভাস্কর্য ইসলাম-সম্মত কিনা তা নিয়ে তেমন কোনো আপত্তি ওঠেনি। যুক্তরাষ্ট্রের সুপ্রিম কোর্টের ভাস্কর্যে ‘অন্যতম শ্রেষ্ঠ আইন প্রণেতা’ উল্লেখ করে আল্লাহর আইনকে মানুষের আইন বলা হয়েছে। এতে সম্মান দেয়া হয়েছে নাকি বিতর্ক তোলা হয়েছে তা বোঝার মতো বোধও অনেকের নেই।

ফতোয়ার সেকাল-একাল

১৯৯৭ সালে যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে রাসুল (সাঃ) এর ভাস্কর্যে তরবারি থাকা নিয়ে আপত্তি উঠেছিল। অনেকে ভাস্কর্যের মুখমণ্ডল সমান করে দেয়ার প্রস্তাব দিয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০০০ সালে সৌদি আরবের ফিকাহ শাস্ত্রের অধ্যাপক তাহা জাবের আল আলওয়ানি এই মর্মে ফতোয়া দেন যে, ‘ভাস্কর্যটি প্রশংসনীয় ও শিক্ষামূলক। এর মাধ্যমে সঠিক বার্তা দেয়া হয়েছে, যা অনেক ভ্রান্তি নিরসনে সক্ষম হবে।’ ইরানের আয়াতুল্লাহ সিসতানীর ফতোয়া মোতাবেক রাসুল (সাঃ) এর ভাস্কর্য বা চিত্রায়ন তাজিমের সঙ্গে উপস্থাপন করা হলে তা জায়েজ।

ইসলাম এমন কোনো ধর্ম নয় যার বিধান সময়ের সঙ্গে পরিবর্তনশীল। তাই একশ বছর আগে যা হারাম ছিল তাকে যদি এখন হালাল হিসেবে গণ্য করা হয়, তাহলে বুঝতে হবে সীমাবদ্ধতা মোল্লাদের চিন্তা চেতনায়। এক সময় মাইকে আজান দেয়াকে বিদআত হিসেবে গণ্য করতেন অনেক আলেম। এ উপমহাদেশেই ইংরেজি শিক্ষাকে নাজায়েজ ফতোয়া দেয়া হয়েছিল।

আজ থেকে দুই যুগ আগেও বিশ্বের প্রায় সকল আলেমের অভিমত ছিল ছবি, ক্যামেরা, টিভি, ভিডিও ইত্যাদি হারাম। দেওবন্দ এখনো এই সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে। তাদের মতে মদ হাতে বানালেও হারাম, মেশিনে বানালেও হারাম, তাই পেইন্টিং ও ডিজিটাল ছবি উভয়ই হারাম। দেওবন্দের ফতোয়া অস্বীকার করে মামুনুল হকরা নিজেদের দেওবন্দি দাবি করেন কীভাবে? আকাবীরদের অনুসরণের কথা বলে তাদের ফতোয়া অমান্য করেন কীভাবে?

এখানে একচেটিয়াভাবে ছবি ও ভাস্কর্যকে হারাম বলা যেমন ইসলাম-সম্মত নয় তেমনি রাসুল (সাঃ) এর ভাস্কর্যের পক্ষে দেয়া ফতোয়াও গ্রহণযোগ্য নয়।

ইসলাম যা বলে:

হারাম বা নাজায়েজ বিষয়গুলো নির্দিষ্ট করা। সাধারণ নিয়মে যা কিছু হারাম সেগুলো ছাড়া সবই হালাল বা মুবাহ। মুস্তাদরাক হাকিম, তিরমিজি ও ইবনে মাজাহ এ বর্ণিত সহি হাদিস অনুসারে হারাম বা হালালের মধ্যবর্তী বিষয়গুলোকে আল্লাহর অনুগ্রহ হিসেবে অনুমতি দেয়া হয়েছে। এছাড়া উপেক্ষা করতে বলা হয়েছে, যদি তা ইবাদত সংশ্লিষ্ট অস্পষ্ট বিষয় হয়।

আল্লাহ বলেন, অতঃপর তোমরা তার কিছু হালাল ও কিছু হারাম করেছ, বলুন, ‘আল্লাহ কি তোমাদেরকে এটার অনুমতি দিয়েছেন, নাকি তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটনা করছ? (সুরা ইউনুস: ৫৯)

ইসলামে ইবাদত ও হারাম/হালাল নির্ধারণের এখতিয়ার শুধুমাত্র আল্লাহর। ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের ইচ্ছানুসারে হারাম-হালাল নির্ধারণকে ক্ষমার অযোগ্য শিরকের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে। (সুরা আন'আম ১৪০)



গরম সব খবর এখানে দেখুন >>>>> 


ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে ভাস্কর্য

কোরআনের কোথাও ছবি আঁকা বা ভাস্কর্য তৈরিকে নিষিদ্ধ বলা হয়নি। মূর্তি বা যেসব জড়বস্তুকে উপাসনা করা হয় তাকে আরবিতে বলা হয় ওয়াসান বা সানাম (বহুবচনে আওসান বা আসনাম)। এর সমার্থক শব্দ হচ্ছে মাবুদ, আল মাবুদ, সুরা, তাগুয়া ইত্যাদি। অন্যদিকে ভাস্কর্যকে বলা হয় তামাসিল/তিমসাল/তামসাল যার ইংরেজি হচ্ছে মেমোরিয়াল, মনুমেন্ট বা স্ট্যাচু। মূর্তি ও ভাস্কর্যের পার্থক্য উপাসনার কারণে। অন্যদিকে হাদিসে নিষেধ করা হয়েছে তাসবীরকে।

কোরআনে সুরা সাবার ১৩ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

‘তারা সোলায়মানের ইচ্ছানুযায়ী উপাসনালয় ও দুর্গ, ভাস্কর্য, হাউযসদৃশ বৃহদাকার পাত্র এবং চুল্লির উপর স্থাপিত বিশাল ডেগ নির্মাণ করত।....”

ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে যে বিধিনিষেধ ছিল না তার ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত রয়েছে। আবু বকর (রাঃ) এর শাসনামলে আমর বিন আসের মিশর অভিযানে ফারাও ও স্ফিংস ভাস্কর্য অক্ষত ছিল। সাদ বিন আবি ওয়াক্কাসের ইরাকে নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার সময়ও কোনো মূর্তি ভাঙ্গা হয়নি।

জাদুঘরে ভাস্কর্য অনুমোদনে ফতোয়া

ভাস্কর্য নিয়ে আপত্তি তোলার সূচনা হয় মূলত ১১ শতাব্দী থেকে ইবনে খুদামা ও ইবনে তাইমিয়ার সূত্র ধরে। বর্তমানে সৌদি আরব (জেদ্দা) সহ প্রায় সকল মুসলিম দেশেই ভাস্কর্য বা ভাস্কর্যের মিউজিয়াম রয়েছে।

এক্ষেত্রে প্রদত্ত ফতোয়ায় বলা হয়, সুরা আন'আম এর ১১ ও সুরা আলে ইমরানের ১৩৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বিশ্ব ভ্রমণ করে দেখতে ও শিখতে বলেছেন। তাই ভাস্কর্য দেখে ইতিহাস সম্পর্কে শিক্ষা গ্রহণ করা যাবে। এছাড়া মিশরের স্ফিংস ও ফেরাউনের মমিকে কোরআনে বর্ণিত আল্লাহর নিদর্শন হিসেবে বিবেচনা করা হয়ছে।

আগের শরীয়তে কি ভাস্কর্য জায়েজ ছিল?

অনেকের মতো মামুনুল হকও কোরআনে ভাস্কর্য সংশ্লিষ্ট আয়াতের প্রেক্ষাপটে বলেছেন, আগের শরীয়তের অনেক কিছু রদ করা হয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে- তিনি আগের শরীয়ত কোথায় পেয়েছেন? কোরআনে বা হাদিসে কি একে আগের শরীয়তের বিধান হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে? সোলায়মান (আ:) সংশ্লিষ্ট আয়াত কোথায় রদ করা হয়েছে? এর সূত্র তিনি দিতে পারবেন না।

আগের শরীয়ত বলতে যদি বাইবেল বোঝানো হয় তাহলে উল্লেখ করা প্রয়োজন যে, বাইবেলের ওল্ড এবং নিউ টেস্টামেন্টেও উপাসনার জন্য মূর্তি তৈরি করা নিষেধ রয়েছে। সুরা মায়েদার ১১০ নম্বর আয়াতে ঈশা (আঃ) কর্তৃক মাটি দিয়ে পাখি সদৃশ তৈরি করে আল্লাহর হুকুমে জীবিত করার কথা উল্লেখ রয়েছে।

মজার ব্যাপার হচ্ছে, কেউ কেউ দাবি করেছেন এই আয়াতে নাকি মূর্তি তৈরি নিষিদ্ধ হওয়ার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে। একজন নবী হারাম কাজ করবেন তা কীভাবে কেউ চিন্তা করতে পারে জানি না! বিভিন্ন বিষয়ে এ জাতীয় হাস্যকর ফতোয়ার তালিকা করলে মহাগ্রন্থ হবে।

তর্কের খাতিরে শরীয়তের বিধান রদের কথা মেনে নিলে মানে দাঁড়ায় এই যে, মুসা (আঃ) ও ইব্রাহিম (আঃ) এর সময়ে ভাস্কর্য নিষিদ্ধ ছিল, সোলায়মান (আঃ) ও ঈশা (আঃ) এর সময়ে আবার অনুমতি দেয়া হয়েছে। আসলেই যদি এমন হতো তাহলে সুস্পষ্টভাবেই নির্দেশ দেয়া হতো, যা মদ, জুয়া, সুদ ইত্যাদি বিষয়ে দেয়া হয়েছে।

হাদিসে নিষিদ্ধ তাসবীর প্রসঙ্গ

হাদিসে যে বিষয়টি নিষেধ করা হয়েছে তা হচ্ছে তাসবীর। একে আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করতে হলে ছবি, ক্যামেরা, ভিডিও সবকিছুকেই হারাম হিসেবে গণ্য করতে হবে। তবে বাংলা বা উর্দু/হিন্দির তাসবীর অর্থ ও আরবির অর্থ এক নয়।

আরবি ব্যাকরণ অনুসারে তাসবীর হচ্ছে ক্রিয়া (বাবে তাফয়িলের মাসদার) অর্থাৎ তাসবীর বলতে ছবি বা চিত্রকর্ম তৈরি করাকে বোঝায় যা উপাসনা করার জন্য তৈরি করা হয়। উপাসনাকে বিবেচনা করেই তাসবীর নিষিদ্ধ করা হয়েছে বলেই ইবনে আব্বাস বর্ণিত হাদিসে রাসুল (সাঃ) কর্তৃক তাসবীর নিষিদ্ধের কথা উল্লেখ করার পর গাছপালা ও প্রকৃতির ছবি আঁকার পরামর্শ দেয়া হয়েছে।

উপাসনার কারণে নিষিদ্ধ ছিল বলেই মাথা ছাড়া ছবি বা প্রাণহীন কিছুর ছবি/চিত্র/শিল্পকর্ম জায়েজ এই মর্মে হাদিস পাওয়া যায়।

ইসলামের বিধিবিধানের ক্ষেত্রে কোরআন ও সুন্নাহর নির্দিষ্ট নির্দেশনার প্রেক্ষাপট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। বিচ্ছিন্ন আয়াত বা হাদিস উল্লেখ করে কেউ ইসলামের বিরোধিতা করে, কেউ ধর্ম ব্যবসা করে। ইসলামের মূল বিষয়বস্তু হচ্ছে তাওহীদ এবং আল্লাহর ইবাদত।

প্রি-ইসলামিক আরবে মূর্তি পূজার প্রচলন ছিল। তখন ঘোড়া, সিংহ, ঈগল ইত্যাদি পশুপাখীর মূর্তিকে দেবতা হিসেবে গণ্য করা হতো। মুহাম্মদ (সাঃ) একত্ববাদের প্রতি ঈমান সুদৃঢ় করার জন্য জীবজন্তুর ছবি আঁকা, মূর্তি তৈরি ইত্যাদি ক্ষেত্রে কঠোরভাবে নিষেধ করেন যেন কেউ পূজার পথে ফিরে না যায়। যেমন: ইসলামের প্রথম যুগে কবর জেয়ারতও নিষিদ্ধ ছিল।

রাসুল (সাঃ) যখন অনুধাবন করলেন যে কবরকে উপাসনালয়ে পরিণত করা হবে না, তখন তিনি কবর জেয়ারতের অনুমতি দেন। অনুরূপভাবে কাবায় থাকা মূর্তিগুলোকে ভাঙার আদেশ দেয়া হলেও চূড়ান্তভাবে অন্যান্য ধর্মাবলম্বীদের উপাসনালয় ও দেব-দেবীর মূর্তির ক্ষেত্রে ধ্বংসাত্মক কার্যকলাপ করার অনুমোদন দেয়া হয়নি।

তাসবীর নিষিদ্ধ করার যে হাদিসগুলো রয়েছে তার সময়কাল বিবেচনা করলে রাসুল (সাঃ) এর ইন্তেকালের দুই বছর আগের হাদিসটি উল্লেখযোগ্য: (আবু দাউদে বর্ণিত ৪১ নং কিতাবের হাদিস নং ৪৯১৪ (কিতাবুল আদাব: ৬২)।

রাসুল (সাঃ) তাবুক যুদ্ধ থেকে ফিরে হযরত আয়েশার (রাঃ) হাতে কিছু পুতুল দেখেন। পুতুলগুলোর একটি ছিল ঘোড়া, যার ডানা কাপড় দিয়া বানানো হয়েছে। রাসুল (সাঃ) জিজ্ঞাসা করেন, ‘ডানাওয়ালা ঘোড়া?’

উত্তরে আয়েশা (রাঃ) বলেন, ‘আপনি কি শোনেননি যে সোলায়মানের ডানাওয়ালা ঘোড়া ছিল?’



গরম সব খবর এখানে দেখুন >>>>> 


এ প্রসঙ্গে আয়েশা বলেন, ‘এতে আল্লাহর রাসুল (সাঃ) এমন অট্টহাসি হাসলেন যে আমি ওনার মাড়ির দাঁত দেখতে পেলাম।’

হালাল ও হারামের নির্ধারক যখন ইলাহ

মূর্তি নিষিদ্ধের কারণ বিবেচনা করলে দেখা যায় ইলাহ বা উপাস্য হিসেবে গ্রহণের বিষয়টি জড়িত। ভাস্কর্য নিষিদ্ধ নয় এমন অভিমতের ভিত্তিও ইলাহ-এর অনুপুস্থিতি। উদাহরণ স্বরূপ: আল্লাহ ছাড়া কারো কাছে মাথা নত করতে হয় না। এটিকে আক্ষরিক অর্থে ধরে নিলে বলতে হবে, শরীরচর্চা বা কোনো কারণে মাথা নিচু করাও নিষেধ। এমন কেউ বলবে না। কারণ ইবাদত একটি আমল যার প্রাথমিক ভিত্তি নিয়ত।

একইভাবে বলা যায়, কবুতর হালাল কিন্তু এই কবুতরকে যদি আমি মাবুদ বা ইলাহ হিসেবে গণ্য করি তখন তা হারাম এবং শিরক বলে গণ্য হবে। অর্থাৎ জীবিত কিছুও হারামের আওতায় আসতে পারে। কিন্তু তাই বলে কবুতর হারাম হয়ে যাবে না। কবুতরের পরিবর্তে কার্যকারণটিকে হারাম হিসেবে বিবেচনা করা হবে। মূর্তি ও ভাস্কর্যের ক্ষেত্রে ঠিক এটিই ঘটছে। আর এ কার্যকারণের কারণেই হজরে আসওয়াদ নিয়ে আপত্তি ওঠেনি।

ইসলামী ব্যক্তিত্বদের অভিমত

কোনো মুফতির পক্ষেই এক পাক্ষিকভাবে ভাস্কর্য বা ছবির বিরুদ্ধে গ্রহণযোগ্য অবস্থান নেয়া সম্ভব নয়। যেমন: ছবি বা ভিডিওর ক্ষেত্রে বৈধতার যে যুক্তি দেয়া হয় তা বিবেচনা করলে মৃত মানুষের ছবি বা ভিডিও নাজায়েজ হওয়ার কথা। আবার পূর্বের ফকিহদের অভিমত যদি ধ্রুব হিসেবে ধরে নিতে হয় তাহলে কোরআন এন্ড মডার্ন সায়েন্স নিয়ে আলোচনা ও যুক্তি মূল্যহীন হওয়ার কথা। ইসলাম একটি শাশ্বত ধর্ম, যার বিধিবিধান একদিকে সুনির্দিষ্ট, অন্যদিকে সময়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

প্রখ্যাত ইসলামী ব্যক্তিত্ব মুহাম্মদ আবদুহু তার প্রদত্ত ফতোয়ায় বলেছেন, ইসলামের ইতিহাস ও ঐতিহ্য তুলে ধরতে চিত্রকর্ম ও ভাস্কর্যের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। আল আজহারের গ্র্যান্ড শায়েখ জাদুল হক, প্রখ্যাত আলেম মুহাম্মদ ইমারাহ, ইউরোপিয়ান ফতোয়া কাউন্সিলের শেখ ফয়সালসহ অনেক ইসলামী ব্যক্তিত্ব ভাস্কর্য ও ছবি অনুমোদনের পক্ষে ফতোয়া দিয়েছেন। ছবি, মূর্তি ও ভাস্কর্য ইস্যুতে যে বিষয়েই সকলে একমত তা হচ্ছে, উপাসনার উদ্দেশ্যে কিছু আঁকা বা ভাস্কর্য তৈরি করা যাবে না।

এখন যারা বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন তারা আসলে ধর্মীয় আবেগকে পুঁজি করে রাজনৈতিক উদ্দেশ্য পূরণ করছেন। কারণ যে হাদিসে উপাসনার জন্য ছবি নিষেধ বলা হয়, সেখানে কুকুর ও রিবাকেও হারাম করা হয়েছে। মদ, মিথ্যাচার, ঘুষ এগুলোও হারাম এবং কবিরা গুনাহর অন্তর্ভুক্ত। নাজায়েজবাদীরা সেসব নিয়ে নীরব কেন?

প্রকৃতপক্ষে কথিত ইসলামী নেতাদের আদর্শ ও অনুপ্রেরণা হচ্ছে তালেবান, আইএস ও আল কায়েদা। তারা আগেও বাংলাকে আফগান বানানোর স্বপ্ন দেখেছে। তালেবানি রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার রাজনীতির বদলে ইসলামের অনুশাসন যদি তাদের পাথেয় হতো, তাহলে 'নাস্তিকদের জ্যান্ত কবর দেয়া হবে', 'ভাস্কর্য বঙ্গোপসাগরে নিক্ষেপ করা হবে', ‘চোখ তুলে নেয়া হবে’ - এ জাতীয় উগ্রবাদী বক্তব্য দেয়ার কথা নয়।


গরম সব খবর এখানে দেখুন >>>>> 


খারেজি মতাদর্শের না হলে তাদের জানার কথা হেদায়েত আল্লাহর এখতিয়ারভুক্ত, যেখানে জোর-জবরদস্তি চলে না। পেশিশক্তির হুমকি দিয়ে আল্লাহর নির্দেশ অমান্য কারা করছে- তা কি বলার অপেক্ষা রাখে? ইসলামী শিক্ষায় শিক্ষিত ব্যক্তি মাত্রই জানার কথা, প্রত্যেককে শুধু নিজের জন্য জবাবদিহি করতে হবে, অন্যের কর্ম সম্পর্কে নয় এবং একজন ইসলাম প্রচারকের কাজ সুন্দর ভাষায় বার্তা পৌঁছে দেয়া, পেশিশক্তি দেখানো নয়।

কোরআনে আল্লাহ বলেছেন, আর যখন তাদেরকে বলা হয়, তোমরা জমিনে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না, তারা বলে, ‘আমরা তো কেবল সংশোধনকারী।

ক্যামেরায় ছবি তোলা : ইসলামের নির্দেশনা।

 ক্যামেরায় ছবি তোলা : ইসলামের নির্দেশনা।

-মাও. মারজান আহমদ চৌধুরী ফুলতলী।



ভাস্কর্য নির্মাণ-কেন্দ্রিক চলমান বিতর্কের মধ্যে ক্যামেরায় ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণ করার বিষয়টি নিয়ে অনেকের মনে প্রশ্ন জেগেছে। বিশেষত, ভাস্কর্য নির্মাণ সংক্রান্ত ইসলামের স্পষ্ট নির্দেশনা উল্লেখ করার পর বিপরীত মতাবলম্বীদের পক্ষ থেকে ছবি তোলার বিষয়টি পাল্টাযুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। তাই এ বিষয়টি পর্যালোচনা করার প্রয়োজন বোধ করছি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাদীস থেকে স্পষ্টভাবে প্রাণীর চিত্রাঙ্কন ও প্রতিকৃতি নির্মাণ করা হারাম সাব্যস্ত হয়। আয়েশা সিদ্দীকা রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেনঃ
فَقَالَ ‏إِنَّ أُولَئِكَ إِذَا كَانَ فِيهِمُ الرَّجُلُ الصَّالِحُ فَمَاتَ بَنَوْا عَلَى قَبْرِهِ مَسْجِدًا وَصَوَّرُوا فِيهِ تِلْكَ الصُّوَرَ، فَأُولَئِكَ شِرَارُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ
"রাসূলুল্লাহ ﷺ (গির্জায় সাজানো প্রতিকৃতির ব্যাপারে) বললেন, তাদের মধ্যে যখন কোনো পুণ্যবান লোক মারা যেত তখন তারা ওদের কবরের ওপর উপাসনার জায়গা নির্মাণ করত এবং এসব প্রতিকৃতি তৈরি করে রাখত। এরা কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে জগতের সবচেয়ে নিকৃষ্ট সৃষ্টি হিসেবে গন্য হবে।" [সংক্ষেপিত, সহীহ বুখারী; কিতাবুস সালাত, সহীহ মুসলিম; কিতাবুল মাসাজিদ]
এখানে যে প্রতিকৃতির কথা বলা হচ্ছে, সেগুলো পূজার মূর্তি নয়। Trinity-তে বিশ্বাসী হলেও খ্রিস্টানরা প্রচলিত অর্থে মূর্তিপূজক নয়। তারা কেবল ভক্তি প্রদর্শনের জন্য প্রতিকৃতি তৈরি করে রাখত। এ হাদীসের আলোকে চার মাযহারের সকল ইমাম-আইম্মার ঐক্যমত হচ্ছে, যে কোনো রূহবিশিষ্ট প্রাণীর চিত্র ও ভাস্কর্য তৈরি করা স্পষ্টত হারাম, চাই যে উদ্দেশ্যে তৈরি করা হোক। হাদীসে প্রাণীর চিত্র ও ভাস্কর্য তৈরি করার শাস্তি সম্পর্কেও স্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ
إِنَّ أَشَدَّ النَّاسِ عَذَابًا يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْمُصَوِّرُونَ ‏
"কিয়ামতের দিন মানুষের মধ্যে সবচেয়ে বেশি শাস্তিপ্রাপ্ত হবে চিত্রকর/ভাস্কর।" [সহীহ বুখারী; কিতাবুল লিবাস, সহীহ মুসলিম; কিতাবুল লিবাস]


লক্ষ্য করলে দেখা যায়, উপরিউক্ত হাদীসসমূহে চিত্র ও ভাস্কর্যের জন্য تصوير (তাসওয়ীর) শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। تصوير শব্দের অর্থ হচ্ছে 'আকার, আকৃতি বা রূপদান করা'। এ শব্দ থেকে আল্লাহর একটি গুণবাচক নাম হচ্ছে ٱلْمُصَوِّرُ বা আকৃতিদাতা [সুরা হাশর : ২৪]। এটি আল্লাহর সৃষ্টিকর্মের সাথে সংশ্লিষ্ট একটি গুণ। যখন হাত দিয়ে تصوير তথা চিত্র ও ভাস্কর্য তৈরি করা হয়, তখন এটি এক ধরণের تخليق বা সৃষ্টিকর্মে পরিণত হয়। মুহাদ্দিস ও ফকীহগণও تصوير শব্দকে 'হাতে তৈরি করা চিত্র বা প্রতিকৃতি' অর্থে গ্রহণ করেছেন। আবার আরবি ভাষায় ক্যামেরায় ধারণ করা ছবিকেও تصوير বলা হয়। তাই বিষয়টি প্রশ্নের জন্ম দেয় যে, তাসওয়ীর যেহেতু হারাম, তাহলে কি ছবি তোলাও হারাম?
ভাষাবিজ্ঞানের সাথে পরিচিতরা জানেন যে, সময় পরিবর্তনের সাথে সাথে শব্দের ব্যবহার পরিবর্তিত হয়, অর্থ বিস্তৃত হয়। প্রাচীন আরবে উটের ক্যারাভানকে বলা হতো 'সাইয়্যারাহ'। আজ 'সাইয়্যারাহ' দ্বারা মোটরগাড়ি বুঝায়। এক সময় 'ক্বাহওয়া' বলা হতো নেশাযুক্ত পানীয়কে। আজ 'ক্বাহওয়া' দ্বারা বুঝায় কফি। আরবি ভাষায় এগুলোর জন্য কোনো শব্দ ছিল না বিধায় আরবরা প্রাচীন শব্দকে আজ নতুন অর্থে ব্যবহার করছে। একইভাবে যখন ক্যামেরা আবিষ্কার হলো, তখন আলাদা শব্দ না থাকায় তাঁরা 'তাসওয়ীর' শব্দের অর্থকে বিস্তৃত করে ক্যামেরার ছবিকেও তাসওয়ীরের অন্তর্ভুক্ত করে ফেলল। এমনকি প্রচলিত আরবি ভাষায় ক্যামেরাকে বলা হয় 'কামিরা', ভিডিওকে বলে 'ফিদিও', ফিল্মকে বলে 'ফিলিম'। তাঁরা আলাদা শব্দ তৈরি করার প্রয়োজন বোধ করেনি। শব্দের এই অভিন্নতাই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।


এবার, ইসলামি শরীয়তের একটি উসূল বা মূলনীতি হচ্ছে-
العبرة في العقود للمقاصد والمعاني لا للألفاظ والمباني
অর্থাৎ, কুরআন-সুন্নাহ থেকে শরীয়তের হুকুম-আহকাম খুঁজে বের করার ক্ষেত্রে শব্দ ও তার গঠন বিবেচ্য নয়; বরং বিবেচ্য বিষয় হচ্ছে শব্দের অর্থ ও এর উদ্দেশ্য। উদাহরণস্বরূপ, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ
كُلُّ مُسْكِرٍ خَمْرٌ وَكُلُّ مُسْكِرٍ حَرَامٌ
"প্রত্যেক নেশাজাতীয় দ্রব্য খামর এবং প্রত্যেক খামর হারাম।" [সহীহ মুসলিম; কিতাবুল আশরিবাহ]
এ হাদীসে যে নিষেধাজ্ঞা এসেছে, তা 'খামর' নামক শব্দের জন্য নয়; বরং مُسْكِر তথা নেশাজাতীয় দ্রব্যের জন্য। কাল যদি কেউ Tang বা রুহ আফজা শরবতের নাম 'খামর' রেখে দেয়, তবুও সেটি হারাম হবে না। কারণ এতে নেশাজাতীয় দ্রব্য নেই। অপরদিকে মদের বোতলে 'শারাবান ত্বাহুরা' লিখে দিলেও অ্যালকোহল কন্টেন্টের জন্য সেটি হারাম-ই থাকবে। এটি উসূলে ফিকহের একটি বুনিয়াদি নীতি।
যেসব হাদীসের আলোকে প্রাণীর চিত্রাঙ্কন ও ভাস্কর্য নির্মাণ হারাম করা হয়েছে, সেসব হাদীস একটু ভালোভাবে লক্ষ্য করলে বুঝা যাবে যে, এই নিষেধাজ্ঞার পেছনে উদ্দেশ্য ছিল দুটি। একটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, প্রাণীর চিত্র বা প্রতিকৃতি তৈরি করার ফলে স্রষ্টা হিসেবে আল্লাহর অদ্বিতীয় বৈশিষ্ট্যে অনধিকার চর্চা করা হয়, যা আল্লাহকে রাগান্বিত করে। আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন যে, আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ
وَمَنْ أَظْلَمُ مِمَّنْ ذَهَبَ يَخْلُقُ كَخَلْقِي، فَلْيَخْلُقُوا حَبَّةً وَلْيَخْلُقُوا ذَرَّةً
"ওই ব্যক্তির চেয়ে বড় যালিম আর কে হতে পারে, যে আমার সৃষ্টির সদৃশ কিছু সৃষ্টি করতে চায়। সামর্থ থাকলে তারা সৃষ্টি করুক একটি বীজ বা একটি অণু।" [সহীহ বুখারী; কিতাবুল লিবাস]
আবদুল্লাহ ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেনঃ
إِنَّ الَّذِينَ يَصْنَعُونَ هَذِهِ الصُّوَرَ يُعَذَّبُونَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يُقَالُ لَهُمْ أَحْيُوا مَا خَلَقْتُمْ
"যারা চিত্র/ভাস্কর্য তৈরি করে, তারা কিয়ামতের দিন শাস্তি পাবে। তাদেরকে বলা হবে, তোমরা যেগুলোকে সৃষ্টি করেছিলে, ওগুলোতে প্রাণ দাও।" [সহীহ বুখারী; কিতাবুল লিবাস, সহীহ মুসলিম; কিতাবুল লিবাস]
উক্ত হাদীসদ্বয় গবেষণা করলে বুঝা যায়, আল্লাহ যেহেতু প্রাণীর আকৃতি দান করেন, তাই এর সদৃশ কিছু অন্য কারও হাতে সংঘটিত হওয়া আল্লাহর পছন্দনীয় নয়। প্রাণীর চিত্রাঙ্কন ও ভাস্কর্য হারাম হওয়ার পেছনে আরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, যেহেতু ভাস্কর্য বা প্রতিকৃতি সম্মান প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়, তাই এতে শিরকের সম্ভাব্য পথ প্রসারিত হয়। তাই আল্লাহ খোলাখুলিভাবে যাবতীয় প্রতিমা পরিহার করার আদেশ দিয়েছেন। পবিত্র কুরআনে বলেছেনঃ


فَاجْتَنِبُوا الرِّجْسَ مِنَ الْأَوْثَانِ وَاجْتَنِبُوا قَوْلَ الزُّورِ
"অতএব তোমরা মূর্তিসমূহের নোংরামি পরিহার করো এবং পরিহার করো মিথ্যা কথাবার্তা।" [সুরা হাজ্জ : ৩০]
প্রক্ষান্তরে, ক্যামেরার ছবিকে যদিও আরবি ভাষায় 'তাসওয়ীর' বলা হয়; তথাপি সেটি تخليق বা সৃষ্টিকর্ম নয়। বরং এক ধরণের reflection বা প্রতিবিম্ব। ক্যামেরা লেন্সের মাধ্যমে আলোকরশ্মি ধারণ করে প্রতিবিম্ব তৈরি করে। আমরা যেভাবে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদেরকে দেখি, ক্যামেরাও একইভাবে আলোর প্রতিফলনের মাধ্যমে বস্তুর অবয়ব ধারণ করে। নাম 'তাসওয়ীর' হলেও হাতে বানানো চিত্র বা প্রতিকৃতি আর ক্যামেরায় ধারণ করা প্রতিবিম্ব এক নয়। তাই প্রাণীর চিত্রাঙ্কন ও প্রতিকৃতি হারাম হওয়ার পেছনের প্রথম উদ্দেশ্যটি এখানে অনুপস্থিত। এ জন্য উলামায়ে কেরাম ক্যামেরায় তোলা ছবি ও ভিডিওকে চিত্রাঙ্কন ও প্রতিকৃতির আওতাভুক্ত করেননি। চিত্রাঙ্কন ও প্রতিকৃতি হারাম হওয়ার দ্বিতীয় উদ্দেশ্য, অর্থাৎ আল্লাহর সাথে শিরকের আশঙ্কা এখানেও বহাল। তাই ক্যামেরায় তোলা ছবি ব্যবহার করে শিরকের সম্ভাবনাযুক্ত যে কোনো কাজ করা স্পষ্টত হারাম।
এ সবগুলো বিষয়কে সামনে রেখে আরব ও অনারব উলামায়ে কেরামের দুটি মতামত পাওয়া যায়।
এক. প্রাক-আধুনিক যুগের কিছুসংখ্যক উলামা ছবি তোলাকে সরাসরি হারাম বলেছেন। আজও স্বল্পসংখ্যক উলামা একান্ত অনিবার্য প্রয়োজন (Dire necessity) ব্যতীত ছবি তোলা হারাম মনে করেন।
দুই. আরব-আজমের সংখ্যাগরিষ্ঠ উলামা ক্যামেরায় ছবি ও ভিডিও ধারণ করাকে জায়েয বলেছেন, যেহেতু এখানে প্রাণীর চিত্রাঙ্কন ও প্রতিকৃতি হারাম হওয়ার পেছনের 'ইল্লাত' তথা কারণ ও উদ্দেশ্য উপস্থিত নেই। যেহেতু 'ইল্লাত' নেই, সেহেতু হুকুমও নেই। তবে একইসাথে তাঁরা বলে দিয়েছেন যে-
★ প্রয়োজন ব্যতীত অহেতুক ছবি তোলা নিন্দনীয় কাজ।
★ যা সাধারণভাবে হারাম, তার ছবিও হারাম। উদাহরণস্বরূপ, বেপর্দা অবস্থায় নিজেকে প্রদর্শন করা যেহেতু হারাম, এ অবস্থার ছবি প্রদর্শন করাও হারাম।
★ মানুষ বা অন্য জীবজন্তুর ছবি ঘরে লটকিয়ে রাখা হারাম। এতে ঘরে ফেরেশতা প্রবেশ করেন না।
★ শিরকের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভক্তি-শ্রদ্ধা বা উপাসনার জন্য ছবির ব্যবহার হারাম।
যদিও প্রথমোক্ত মতটি তাকওয়ার অধিক নিকটবর্তী; তথাপি সামগ্রিক প্রয়োজন ও পরিস্থিতি বিবেচনায় বর্তমান যুগের প্রায় সব আলিম-উলামা ২য় মতকে প্রাধান্য দিয়েছেন। পরিশেষে, প্রকৃত ও পরিপূর্ণ জ্ঞান কেবল আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়া-তা'আলার কাছে নিহিত।।